রবিবার ২৬ এপ্রিল ২০২৬ - ১৩:৫৪
ওয়াশিংটনের দুর্বলতার মুখে তেহরানের শক্ত অবস্থান

একটি আমেরিকান সাময়িকী ইরানের সাথে আলোচনায় ওয়াশিংটনের দুর্বলতার বিপরীতে তেহরানের শক্ত অবস্থান তুলে ধরেছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, পলিটিকো সাময়িকী একটি নিবন্ধে ইরানের সাথে আমেরিকার আলোচনা প্রসঙ্গে ওয়াশিংটনের দুর্বলতার বিপরীতে তেহরানের শক্ত অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেছে।

এই প্রতিবেদনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ইরানের হাতিয়ার (লিভারেজ)

ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু বিশ্লেষক ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে ওয়াশিংটন আলোচনার টেবিলে বেশ কিছু গুরুতর দুর্বলতা নিয়ে বসছে, অন্যদিকে তেহরানের হাতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার। সম্প্রতি ব্যাপক বোমাবর্ষণের মাঝেও ইরানের নাগরিকরা বিদ্রোহ করেনি। তাছাড়া, ইরান হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত থাকায়, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের হাতে এখনও চাপ প্রয়োগের মাধ্যম বিদ্যমান।

২. অভিজ্ঞতা বনাম অনভিজ্ঞতা

সম্ভবত ইরানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তার স্থিতিশীল ও অভিজ্ঞ আলোচক দল। বুশ প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল সিং স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানি আলোচকরা প্রায়শই সেই একই দল যারা বেশ কয়েকটি আমেরিকান প্রশাসনের সঙ্গে টেবিলে বসেছে। এই সঞ্চিত অভিজ্ঞতা তাদের এমনভাবে ছাড় বিনিময় করতে সাহায্য করে যা দেখতে আমেরিকার পক্ষে উপকারী মনে হলেও বাস্তবে ইরানের কাছ থেকে কিছুই ছিনিয়ে নেয় না। এর বিপরীতে, প্রতিটি নতুন আমেরিকান প্রশাসনকে এই জটিল বিবরণগুলো নতুন করে এবং সবচেয়ে কঠিন উপায়ে শিখতে বাধ্য হয়।

৩. হরমুজ প্রণালী

সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও, ইরান একটি কার্যকর চাপের হাতিয়ার হিসেবে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সমুদ্রপথগুলোর একটি এই প্রণালী তেহরানকে যথেষ্ট দরকষাকষির ক্ষমতা দিয়েছে যা ওয়াশিংটন উপেক্ষা করতে পারে না। এই পরিস্থিতির অর্থনৈতিক পরিণতি ইতোমধ্যেই আমেরিকানদের ওয়ালেটে চাপ সৃষ্টি করছে।

৪. অভ্যন্তরীণ ঐক্য বনাম আমেরিকার বিভক্তি

ইরান যেখানে তুলনামূলকভাবে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসে, সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের একাধিক জটিল মোকাবিলার সম্মুখীন। ইরান-বিরোধী চরমপন্থী গোষ্ঠী, ওয়াশিংটনের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক, ইসরাইল এবং কিছু আরব দেশ-সবাই মিলে সম্ভাব্য যেকোনো চুক্তি দুর্বল করার জন্য প্রস্তুত। এই চাপগুলো ট্রাম্পের ছাড় দেওয়ার ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে সীমিত করে দিয়েছে।

৫. ট্রাম্পের কৌশলগত দুর্বলতা; পরিকল্পনার অভাব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এখনও মৌলিক প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর নেই: তার ন্যূনতম দাবিগুলো কী? তিনি কি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ব্যবস্থাকে ক্ষমতায় মেনে নিতে প্রস্তুত? তিনি কী কী ছাড় দিতে প্রস্তুত? এই কৌশলগত অস্পষ্টতা ইরানের সুপরিকল্পিত পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থান করছে, যারা বহু বছর ধরে নিজেদের লালরেখা সম্পর্কে জানে।

৬. পরস্পরবিরোধী বিবৃতি; ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে একটি অস্ত্র

ট্রাম্পের ঘন ঘন পরস্পরবিরোধী বিবৃতি-যেখানে কখনো তিনি 'সর্বোচ্চ চাপ' এবং কখনো 'মহার্ঘ চুক্তি'র কথা বলেন-তার ফলে অভিজ্ঞ ইরানি আলোচকরা এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিতে পারেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র বিশ্লেষক আলী ভায়েজ জোর দিয়ে বলেছেন, পারস্পরিক সম্মান এবং একটি জয়-জয় চুক্তির প্রস্তুতি ছাড়া কোনো চুক্তি সম্ভব হবে না।

৭. আমেরিকার কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা

ট্রাম্প প্রশাসনের 'একা একা কাজ করার' নীতি ওয়াশিংটনের আরেকটি গুরুতর দুর্বলতা। কোনো চুক্তি হলে, আমেরিকার রাশিয়া ও চীনের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে-উদাহরণস্বরূপ, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের ক্ষেত্রে। কিন্তু আমেরিকার একতরফা নীতি এই সহযোগিতা কঠিন করে তুলেছে। ইরান এই বিভাজন সম্পর্কে সচেতন এবং এর সুবিধা নিতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন যদি প্রস্তুতির এই একই স্তর নিয়ে গুরুত্ব সহকারে আলোচনায় বসে, তাহলে তারা শুধু চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে না, বরং এমন কিছু ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে যা পরবর্তীতে দিতে তারা অনুতপ্ত হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha